অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে! আলোয় ফিরছে আলিপুরদুয়ার জেলার গর্ব— বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প (Buxa Tiger Reserve)

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা দূরদর্শন ও অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর তরফে জানানো হয়েছে, উত্তরবঙ্গের বক্সা টাইগার রিজ়ার্ভে ‘টাইগার রিইন্ট্রোডাকশন প্ল্যান’ বা ‘টাইগার অগমেন্টেশন প্রোগ্রাম’ (Tiger Augmentation Programme) পুরোপুরি কার্যকর হতে চলেছে। এই প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখা এখনই প্রকাশ্যে না এলেও, বনমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII) এবং জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের (NTCA) যাবতীয় কঠোর প্রোটোকল ও গাইডলাইন মেনেই অন্য জঙ্গল থেকে বাঘ এনে বাংলার এই জঙ্গলে ছাড়া হবে।

Screenshot

পশ্চিমবঙ্গে বাঘের প্রধান দুটি বাসস্থান— দক্ষিণে সুন্দরবন ও উত্তরে বক্সা। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ১০০ ছাড়ালেও, ১৯৮৩ সালে দেশের ৩৩ তম টাইগার রিজ়ার্ভ হিসেবে যাত্রা শুরু করা বক্সা বরাবরই ‘লো ডেনসিটি’ (Low Density) বাঘ-জঙ্গল হিসেবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, রাজ্যে পালাবদলের ঠিক পরেই বক্সায় পাকাপাকি ভাবে বাঘ আনার এই সুখবর এল। কেন্দ্রের মতে, এই রিইন্ট্রোডাকশন প্ল্যান সফল হলে উত্তরবঙ্গে বাঘ বিচরণের এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হবে।

অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা বক্সা

এই পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। একসময় রাজস্থানের সরিস্কা বা মধ্যপ্রদেশের পান্নার মতো বক্সাও বাঘশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে সরিস্কা বা পান্নায় চোরাশিকারের দৌরাত্ম্য থাকলেও বক্সায় তেমন কোনো বড় অভিযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও, ১৯৯৮ সালের পর টানা ২৩ বছর বক্সার কোর এলাকার ২৬ মাইলের মধ্যে ক্যামেরায় কোনো বাঘের ছবি ধরা পড়েনি। ২০০৪ সালে জয়ন্তী রোডে বাঘ দেখা যাওয়ার কথা লোকমুখে শোনা গেলেও তার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না।

২০০৬ থেকে শুরু হওয়া জাতীয় বাঘসুমারিতে পরপর তিনবার (২০১০, ২০১৪, ২০১৮) বক্সা ‘বাঘশূন্য’ তকমা পায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এনটিসিএ (NTCA) রাজ্যের কাছে কৈফিয়ত তলব করে এবং বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্কের জেরে বক্সায় প্রজেক্ট টাইগারের অনুদান পর্যন্ত সাময়িক বন্ধ রাখা হয়।

অবশেষে ১১ ডিসেম্বর ২০২১, বক্সার জঙ্গলে বসানো ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে বাঘের ছবি! ২০২২-এর জাতীয় বাঘশুমারি (যা ২০২৩-এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়) উত্তরবঙ্গের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করে। এই রিপোর্টে বাঘের বিচরণ এলাকা হিসেবে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প, নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান এবং মহানন্দা অভয়ারণ্যের নাম উঠে আসে।

বক্সা

কঠোর নজরদারি ও হ্যাবিট্যাট ম্যানেজমেন্ট

বক্সায় এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে বনদপ্তরের ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রচেষ্টা। ফেজ ফোর মনিটরিং (Phase IV Monitoring) প্রোটোকল এবং এম-স্ট্রাইপস (M-STrIPES) অ্যাপের মাধ্যমে নির্ভুল ডেটা এন্ট্রি ও নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির ফলে জঙ্গলের কোর এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা সম্ভব হয়েছে। ওয়েস্ট ডিভিশনসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়মিত পায়ের ছাপ (Pugmark) বিশ্লেষণ এবং ট্রানজেক্ট লাইন ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে হ্যাবিট্যাট ম্যানেজমেন্ট বা বাসস্থান উন্নয়নে। বাঘের শিকারের (Prey-base) সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি কোর এরিয়া থেকে মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো হয়েছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো গাঙ্গুটিয়া এবং অতি সম্প্রতি (২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলা) ভুটিয়া বস্তি রিলোকেশন প্রজেক্টের যুগান্তকারী সাফল্য। এই গ্রামগুলোর সফল স্থানান্তরের ফলে জঙ্গলের কোর এলাকায় তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ ‘ইনভায়োলেট স্পেস’ বা নিরুপদ্রব জঙ্গল, যা বাঘের অবাধ বিচরণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।

বক্সা করিডোর ধরে বাঘের আনাগোনা

২০১৭ সালের শীতে নেওড়া ভ্যালিতে এক গাইডের ক্যামেরায় প্রথম বাঘের ছবি ধরা পড়ে। এরপর থেকে বক্সাতেও নিয়মিত বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। বক্সায় বাঘ আনার জন্য ২০১৭ সালের শুরুতেই গ্লোবাল টাইগার ফোরাম এবং এনটিসিএ-র কাছে একটি ডিপিআর (DPR) জমা পড়েছিল। রাজ্যের তৎকালীন প্রধান মুখ্য বনপাল প্রদীপ ব্যাস তখন অসমের কাজিরাঙা বা ওরাং (যেখানে বাঘের সারপ্লাস পপুলেশন রয়েছে) থেকে বাঘ আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

সেই ডিপিআর জমা পড়ার ঠিক সাত বছর পর, ২০২৪-এর জানুয়ারিতে একটি পুরুষ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার অসমের মানস থেকে পায়ে হেঁটে বক্সায় ঢুকে পড়ে (যাকে ২০২৩-এর জানুয়ারিতে মানসে দেখা গিয়েছিল)। এরপরে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেও অল-ইন্ডিয়া সেন্সাস চলাকালীন বক্সায় বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

উত্তরবঙ্গে বাঘ যাতায়াতের দুটি রুট এখন স্পষ্ট: ১. ভুটানের হা অভয়ারণ্য থেকে জিগমে খেসার নেচার রিজ়ার্ভ দিয়ে সিকিমের প্যাঙ্গোলাখা অভয়ারণ্য পার করে নেওড়া ভ্যালি। ২. অসমের মানস থেকে ভুটানের ফিবসু অভয়ারণ্য হয়ে বক্সার জঙ্গল।

এতদিন বাঘেরা ট্রানজ়িশান বা টেরিটরি এক্সটেনশনের কারণে বক্সায় এলেও, ‘রেসিডেন্ট’ বা স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থাকেনি। এবার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে, উন্নত বাসস্থান এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ‘রেসিডেন্ট’ বাঘ পেতে চলেছে বক্সা।

এককালে বাঘশূন্য হয়ে যাওয়া সরিস্কায় এখন বাঘের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে, দারুনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পান্নাও। এবার পালা বক্সার।

Tiger 2023

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *