হাতি

অরুণাচল প্রদেশে ৩,২৬৬ মিটার উচ্চতায় হাতির সন্ধান: বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে হাতির বাসস্থানের রেকর্ড

অরুণাচল প্রদেশের ইগলনেস্ট ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে ৩,২৬৬ মিটার উচ্চতায় এশিয়ান হাতির সন্ধান মিলেছে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে হাতির বাসস্থানের রেকর্ড। জানুন এই যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য।

হাতি

Camera trapping image of an elephant in Eaglenest Wildlife Sanctuary in Arunachal Pradesh. Credit: WWF-India

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে। সাধারণত সমতল বা সামান্য পাহাড়ি অঞ্চলেই আমরা হাতির বিচরণ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এবার সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,২৬৬ মিটার (প্রায় ১০,৭১৫ ফুট) উঁচুতে এশিয়ান হাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি শুধুমাত্র ভারতের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্যই একটি নতুন রেকর্ড, কারণ এর আগে পৃথিবীর আর কোথাও এত উচ্চতায় হাতির উপস্থিতির কোনো প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি। ডেকান হেরাল্ড-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশের ইগলনেস্ট ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে (Eaglenest Wildlife Sanctuary) সম্প্রতি এই বিরল দৃশ্য ক্যামেরা-ট্র্যাপে ধরা পড়েছে।

এই বিস্তৃত প্রতিবেদনে আমরা এই আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট, হাতির এই উচ্চতায় চলে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ, অরুণাচল প্রদেশে হাতির বর্তমান অবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান মানুষ-হাতি সংঘাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও যুগান্তকারী আবিষ্কারের নেপথ্য কাহিনী

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার, ইন্ডিয়া (WWF-India) এবং অরুণাচল প্রদেশের বন দপ্তরের একটি যৌথ দল রাজ্যব্যাপী হাতির বন্টন ও সংরক্ষণের পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালনা করছিল। এই সমীক্ষাটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এরই অংশ হিসেবে ওয়েস্ট কামেং (West Kameng) জেলায় অবস্থিত ইগলনেস্ট ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হয়েছিল।

বিস্ময়করভাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যবর্তী সময়ে, এই ক্যামেরা ট্র্যাপগুলোতে তিনটি হাতির একটি ছোট পালের ছবি ধরা পড়ে। মোট দুটি আলাদা ছবিতে এই তিনটি হাতিকে এত উঁচুতে বিচরণ করতে দেখা যায়, যা বন্যপ্রাণী গবেষকদের হতবাক করে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, হাতি সাধারণত পাদদেশ বা সমতল অঞ্চলেই বেশি থাকে এবং মাঝে মাঝে ২০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত তাদের যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ৩,২৬৬ মিটার উচ্চতায় তাদের এই উপস্থিতি এর আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

কেন এত উঁচুতে হাতি? ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণ

এত উঁচুতে হাতির এই বিচরণের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। WWF-India-এর একজন আধিকারিক ডেকান হেরাল্ডকে জানিয়েছেন যে, ইগলনেস্ট স্যাংচুয়ারির ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলটি ‘ডোয়ার্ফ ব্যাম্বু’ (Dwarf bamboo – বৈজ্ঞানিক নাম Arundinaria sp.) বা বামন বাঁশ গাছে পরিপূর্ণ। এর পাশাপাশি, সেখানে একাধিক উচ্চ-পার্বত্য হ্রদ এবং জলাভূমি রয়েছে।

হাতির প্রধান খাদ্যের একটি বড় অংশ হলো বাঁশ এবং ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। সেই সঙ্গে তাদের প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন হয়। তাই এই উঁচুতে পর্যাপ্ত খাবার এবং জলের সহজলভ্যতা হাতিগুলোকে এই দুর্গম এলাকায় আকর্ষণ করে থাকতে পারে। তবে, খাদ্যের সন্ধানের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) এবং সমতলে বাসস্থানের সংকোচনও এর পেছনে একটি বড় প্রভাবক হতে পারে কি না, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

উত্তর-পূর্ব ভারতে হাতির সংখ্যা ও পরিবেশ

সমগ্র ভারতে বর্তমানে প্রায় ৩০,০০০ এশিয়ান হাতি রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত, যা তার পাহাড়, পর্বত এবং গভীর অরণ্যের জন্য বিখ্যাত, সেখানে হাতির সংখ্যা প্রায় ১০,১৩৯টি। এটি এশিয়ান হাতির অন্যতম বৃহত্তম একটি প্রাকৃতিক বাসস্থান। শুধুমাত্র অরুণাচল প্রদেশের কথা বললে, সেখানকার ২৮টি জেলার মধ্যে ১৭টি জেলা জুড়ে প্রায় ১,৬১৪টি হাতির বাস।

অরুণাচল প্রদেশে হাতির বাসস্থান মূলত রাজ্যের বনাঞ্চল, যার মধ্যে উপক্রান্তীয় চওড়াপাতা যুক্ত বন (subtropical broadleaf forests) এবং আর্দ্র পর্ণমোচী বনভূমি (moist deciduous forests) অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, চলাচলের পথ এবং খাদ্যের সন্ধানে তারা অনেক সময় কৃষিজমি ও অনুর্বর প্রান্তরও ব্যবহার করে। এই হাতিগুলো প্রায়শই ভুটান, অরুণাচল প্রদেশ এবং আসামের মধ্যে পরিযান (migrate) করে থাকে।

বাসস্থানের ব্যাপক সম্প্রসারণ: একটি নতুন পরিসংখ্যান

সাম্প্রতিক সমীক্ষাটি অরুণাচল প্রদেশে হাতির রেঞ্জ বা বিচরণক্ষেত্রের একটি চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেছে। ২০১৭ সালের হাতির বন্টন মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে রাজ্যটিতে মূলত চারটি প্রধান হাতির পপুলেশন ক্লাস্টার বা জনসংখ্যা গোষ্ঠী চিহ্নিত করা হয়েছিল:

  • খেলং বন বিভাগ থেকে বান্দরদেওয়া বন বিভাগ (Khellong to Banderdewa)
  • বান্দরদেওয়া থেকে ইংকিয়ং (Banderdewa to Yingkiong)
  • পাশিঘাট থেকে লোহিত (Pasighat to Lohit)
  • আনজাও থেকে কানুবাড়ি বন বিভাগ (Anjaw to Kanubari)

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমান সমীক্ষা এবং অরুণাচল প্রদেশের বন দপ্তরের দেওয়া রেকর্ডের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, হাতির বর্তমান বিচরণক্ষেত্র ২০১৭ সালের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হাতির বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৭,০০১ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে এই এলাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১২,৪৪৬ বর্গ কিলোমিটারে, যা প্রায় ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে! হাতির এই বিপুল বাসস্থানের সম্প্রসারণ একদিকে যেমন তাদের অভিযোজন ক্ষমতার পরিচায়ক, তেমনি অন্যদিকে এটি নতুন সংঘাতেরও জন্ম দিচ্ছে।

মানুষ-হাতি সংঘাত: একটি গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট

হাতির বিচরণক্ষেত্র বাড়লেও তাদের মূল প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে। “ম্যানেজিং হিউম্যান-এলিফ্যান্ট কনফ্লিক্ট ইন অরুণাচল প্রদেশ” (Managing Human-Elephant Conflict in Arunachal Pradesh) শীর্ষক সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, মানুষের বসতি সম্প্রসারণ, বড় বড় পরিকাঠামো প্রকল্প, পাম তেলের চাষ (oil palm cultivation), বাসস্থানের অবনতি এবং হাতির চলাচলের ঐতিহাসিক করিডোরগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ভূমির ব্যবহার (land-use patterns) ব্যাপক মাত্রায় পরিবর্তিত হয়েছে। বনের ভেতর মানুষের এই অবৈধ প্রবেশ ও উন্নয়নমূলক কাজের ফলে হাতিরা বাধ্য হচ্ছে লোকালয়ে প্রবেশ করতে, যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত।

পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে মানুষ-হাতি সংঘাতের ১,৫০৩টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, এই একই সময়ের মধ্যে সংঘাত এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কারণে ১৭টি হাতিরও করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে হাতি এবং মানুষ—উভয়কেই চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে।

সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের করণীয়

অরুণাচল প্রদেশে পরিচালিত এই সর্বশেষ সমীক্ষাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাতির বন্টন, মানুষ-হাতি সংঘাতের হটস্পট চিহ্নিতকরণ, বাসস্থানের ওপর চাপ এবং ল্যান্ডস্কেপ কানেক্টিভিটি বা এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়ার পথগুলোর অবস্থা খতিয়ে দেখা। ৩,২৬৬ মিটার উঁচুতে হাতির সন্ধান পাওয়া প্রমাণ করে যে এই বন্যপ্রাণীরা বেঁচে থাকার তাগিদে নিজেদের অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে, শুধুমাত্র নতুন আবাসস্থলের সন্ধান পেলেই সমস্যার সমাধান হবে না। হাতিদের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য তাদের চলাচলের করিডোরগুলোকে সুরক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি। বন ধ্বংস করে পাম তেলের চাষ বা অপরিকল্পিত নগরায়ণ হাতির বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে, যা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষদের সচেতন করা এবং হাতি লোকালয়ে এলে কীভাবে নিরাপদে তাদের বনে ফেরত পাঠানো যায়, সেই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি।

ইগলনেস্ট ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির ৩,২৬৬ মিটার উচ্চতায় এশিয়ান হাতির এই অভাবনীয় উপস্থিতি বন্যপ্রাণী গবেষণায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনে যদি মানুষের তৈরি করা ধ্বংসলীলার পরোক্ষ হাত থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে সমগ্র জীবজগতের জন্যই অশনিসংকেত।

অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়ের চূড়ায় হাতির এই নতুন যাত্রাপথ আমাদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে—বন্যপ্রাণীদেরও নিজস্ব একটি নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন। আমরা যদি এখন থেকেই তাদের বাসস্থান রক্ষায় এগিয়ে না আসি, তবে আগামী দিনে মানুষ-হাতি সংঘাত এক চরম আকার ধারণ করবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পৃথিবীর বৃহত্তম এই স্থলচর প্রাণীটির সুরক্ষায় আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *