চিতাবাঘ

ভারতের জয়পুর শহরের ‘শহুরে’ চিতাবাঘদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

জয়পুরের ঝালানা বনাঞ্চলে চিতাবাঘের উচ্চ ঘনত্ব এবং মানুষের সাথে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিয়ে এক চমকপ্রদ গবেষণা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

একটু কল্পনা করুন তো! আপনি কোনো পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে আছেন, আর হঠাৎ দেখলেন বড়সড় একটা বিড়াল আপনার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। প্রথম দেখায় হয়তো ভাববেন, ওটা আপনার কোনো প্রতিবেশীরই পোষা বিড়াল। কিন্তু দ্বিতীয়বার ভালো করে তাকাতেই আপনার পিলে চমকে যাবে—কারণ ওটা আসলে আস্ত একটা বুনো চিতাবাঘ!

আধুনিক ভারতের প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া শহুরে পরিবেশে বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে চিতাবাঘের দেখা মেলাটা এখন আর খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। জঙ্গল আর শহরের সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে, আর টিকে থাকার তাগিদে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় আদিবাসীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের কারণে তারা বন্যপ্রাণীদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হন। এর ফলে পারস্পরিক শত্রুতা কমে যায় এবং অনেক সময় তা এক চমৎকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রূপ নেয়।

চিতাবাঘ

Camera trap photo of a leopard with Jaipur in the background. Photo Swapnil Kumbhojkar

ঝালানা সংরক্ষিত বনাঞ্চল: সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ

উত্তর-পশ্চিম ভারতের ঝালানা সংরক্ষিত বনাঞ্চল (Jhalana Reserve Forest) মানুষ ও চিতাবাঘের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি অন্যতম সেরা উদাহরণ।

  • অবস্থান: প্রায় ৩.৯ মিলিয়ন মানুষের শহর জয়পুর দিয়ে ঘেরা এই বনাঞ্চলের আয়তন ২৯ বর্গ কিলোমিটার।
  • ইতিহাস: একসময় জয়পুরের রাজপরিবারের শিকারের জায়গা এই ঝালানা, ২০১৭ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয়।
  • বর্তমান পরিস্থিতি: আগে স্থানীয়রা পশুপালন বা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের মতো কাজের জন্য এই জঙ্গলের ওপর নির্ভর করতেন। তবে, বনাঞ্চলের ভেতরে ও আশেপাশে মানুষের ক্রমাগত আনাগোনা ও যাতায়াতের মধ্যেও ঝালানার শীর্ষ শিকারী বা ‘অ্যাপেক্স প্রিডেটর’ চিতাবাঘেরা (Panthera pardus fusca) শুধু টিকেই নেই, বরং বেশ ভালোভাবেই বংশবৃদ্ধি করছে।

গবেষণা এবং চমকপ্রদ তথ্য

চিতাবাঘ সংরক্ষণ এবং তাদের আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তার জন্য এই সম্পর্কটা বোঝা খুবই জরুরি। প্রাথমিক তথ্যের অভাবেই আমরা ঝালানার বাস্তুতন্ত্র, চিতাবাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা শুরু করি। আন্তর্জাতিক ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় প্রকৃতিবিদ এবং গ্রামবাসীদের নিয়ে তৈরি আমাদের একটি দল ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো, চিতাবাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং জয়পুরের বাসিন্দা ও পর্যটকদের সচেতন করার কাজ করেছে।

আশ্চর্যজনক ঘনত্ব: আমরা মাত্র ২৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ২৫টি আলাদা চিতাবাঘ শনাক্ত করেছি। এটি চিতাবাঘের সর্বোচ্চ ঘনত্বের (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ০.৮৬টি) অন্যতম একটি রেকর্ড! এই উচ্চ ঘনত্বই প্রমাণ করে যে, মানুষের তৈরি করা পরিবর্তনের সাথে চিতাবাঘ কতটা সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

খাদ্যাভ্যাস: পরোক্ষভাবে মানুষের উপকার

চিতাবাঘের খাদ্যাভ্যাস বেশ বৈচিত্র্যময়। তারা যেমন তাজা শিকার ধরে খায়, তেমনি মৃত প্রাণীর মাংসও খায়। ঝালানার চিতাবাঘেরা ঠিক কী খায়, তা জানতে আমরা তাদের মল থেকে পাওয়া শিকারের চুল, হাড় ও নখ বিশ্লেষণ করেছি।

  • আমাদের বিশ্লেষণে ১৩ প্রজাতির প্রাণীর খোঁজ মিলেছে।
  • তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো— ঝালানা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এই চিতাবাঘেরা মূলত কুকুর, বিড়াল বা ছাগলের মতো গৃহপালিত প্রাণীর ওপরই প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল
  • এরা বনাঞ্চলের ভেতরের বন্য প্রাণী, আশেপাশের গৃহপালিত প্রাণী এবং অবৈধভাবে জঙ্গলে চরানো ছাগল শিকার করে খায়।

মজার ব্যাপার হলো, ঝালানার চিতাবাঘেরা পরোক্ষভাবে তাদের প্রতিবেশী মানুষদের উপকারই করছে! চিতাবাঘের এই খাদ্যাভ্যাসের কারণেই জয়পুরে কুকুরের কামড় এবং র‍্যাবিস (জলাতঙ্ক) সংক্রমণের হার পুরো ভারতের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।

ভবিষ্যতের আশা ও সহাবস্থান

এই শীর্ষ শিকারীর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানা থাকলে তা বনবিভাগকে ভবিষ্যতে জঙ্গলে বন্য শিকারের সংখ্যা বাড়াতে এবং গবাদিপশু মারা গেলে স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সঠিক পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে। সবচেয়ে স্বস্তির কথা হলো, ঝালানা বা এর আশেপাশে আজ পর্যন্ত চিতাবাঘের হামলায় কোনো মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি

ঝালানা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মতো এমন একটি জনবহুল এলাকায় মানুষ ও চিতাবাঘের সহাবস্থান বেশ স্পর্শকাতর হলেও, এখানকার মানুষ ও চিতাবাঘ দশকের পর দশক ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে। স্থানীয়রা এখানকার বন্যপ্রাণীদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল।

Leopard cubs playing in a temple. Photos: Swapnil Kumbhojkar

বর্তমানে এখানকার চিতাবাঘেরা মানুষের উপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই মেনে নিয়েছে; এমনকি পর্যটকদের সামনেই মা চিতাবাঘকে তার শাবক নিয়ে জলাশয়ে জল খেতে আসতে দেখা যায়। আমরা আশা করি, আমাদের এই গবেষণা ভূমির সঠিক ব্যবহার এবং জয়পুরের এই ‘শহুরে’ চিতাবাঘদের সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Original Article: Swapnil Kumbhojkar, Reuven Yosef & Piotr Tryjanowski, Bangali : Mayukh Ghose

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *